ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় সত্রাশিয়া বাজারে দীর্ঘদিনের একটি মাদকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাতে মাদকের ভয়াল থাবায় অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে চকনারায়নপুর, গাড়াইকুটি, সত্রাশিয়া, সাতাশিয়া, গন্ধর্বপুর এবং পাইকাশিমুলসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাদকের আস্তানায় হামলা চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কুমারগাতা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান অতুনের ছোট ভাই নামধারী বিএনপি নেতা এলাকার চিহ্নিত মাদক সম্রাট আসাদুল, জাকির ও আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে বাজারে এই আস্তানাটি চালিয়ে আসছিল। এই মাদকের আখড়ার কারণে এলাকায় বখাটেদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় নারী ও স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের স্বাভাবিক চলাচল চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছিল। এর আগে বিভিন্ন সময় স্থানীয় সচেতন মহল এর প্রতিবাদ জানালেও কোনো লাভ হয়নি, উল্টো প্রতিবাদকারীদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি প্রদর্শন করে আসাদুল বাহিনী।
তবে প্রতিনিয়ত হুমকি ও মাদকের ভয়াল থাবায় অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে চকনারায়নপুর, গাড়াইকুটি, সত্রাশিয়া, সাতাশিয়া, গন্ধর্বপুর এবং পাইকাশিমুল গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় উত্তেজিত জনতা একজোট হয়ে উক্ত মাদকের আস্তানায় হামলা চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়।
ঘটনার পর চতুর আসাদুল বাহিনী নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে ওই মাদক আস্তানাটিকে একটি ‘আড়তের অফিস’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা ও প্রচারণা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের স্পষ্ট দাবি, এখনই যদি এই মাদক কারবারিদের কঠোর হস্তে দমন করা না যায়, তবে পুরো এলাকা অচিরেই মাদকের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। শুধু তাই নয় হিজরাদের দিয়ে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই মাদকের আস্তানার কারণে বাজারে শান্তিতে ব্যবসা করার পরিবেশ ছিল না। দিন-রাত বখাটে আর মাদকসেবীদের আড্ডা চলত। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে আসাদুলের লোকজন আমাদের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিত। এলাকাবাসী মিলে এটি ভেঙে দিয়ে খুব ভালো কাজ করেছে, আমরা এখন শান্তিতে ব্যবসা করতে চাই।’
এ বিষয়ে সিএনজি চালক আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘বাজারে গাড়ি পার্কিং করে রাখা দায় হয়ে পড়েছিল। মাদকসেবীরা প্রায়ই যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করত এবং আমাদের ওপর চড়াও হতো। নারী যাত্রীরা এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে ভয় পেত। এই আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ায় আমাদের চালক ও যাত্রী সবার মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় অটোরিক্সা চালক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আসাদুল ও তার ভাইয়েরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এখানে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। আস্তানা ভাঙার পর এখন তারা এটাকে আড়ত ঘর বলে মিথ্যা নাটক সাজাচ্ছে। প্রশাসন যেন এদের মিথ্যা কথায় কান না দিয়ে এই মাদক চক্রের সবাইকে দ্রæত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় ভ্যান চালক আক্কাস বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, সারাদিন খাটাখাটনি করে খাই। এই মাদক আস্তানার কারণে এলাকার পরিবেশ এত নষ্ট হয়েছিল যে ঘরের মা-বোনদের বাজারে পাঠাতে পারতাম না। এলাকার সবাই মিলে যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে আমরা সাধারণ মানুষ খুব খুশি হয়েছি।’
স্থানীয় মুদি দোকানদার একাব্বর আলী বলেন, আসাদুল, আনোয়ার, জাকির রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে। প্রতি রাতে আসাদুল এখানে মাদকের জজমা বসায় কেউ তাদেরকে কিছু বলতে পারে না। আল্লাহ এতদিনে এদের বিচার করছে।
এদিকে সমাজ রুপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি সমাজসেবক ইমতিয়াজ আহমেদ তানছেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই সিন্ডিকেটের পেছনে কিছু প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন থাকায় এতদিন কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। এলাকাবাসী যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, এখন প্রশাসনের উচিত হবে মূল হোতাদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে এলাকায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা।
এদিকে মাদকের আস্তানা ভাঙচুর ও সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত আসাদুল হক আসাদকে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি, যার ফলে উনার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ভাই আনোয়ারকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কলটি কেটে দেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তাছাড়া এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

