
দেয়ালে এখনো লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। আধাপাকা ঘরের ছোট্ট কক্ষটিতে রয়েছে একটি খাট, পড়ার টেবিল, কাপড় রাখার আলনা ও একটি ট্রাঙ্ক। সবকিছুই পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা। এই ঘরেই দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান রুবিনা আক্তার। ছেলের ব্যবহৃত কাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে কখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন, কখনো আবার তার স্মৃতিচিহ্নগুলো নীরবে উল্টেপাল্টে দেখেন। রাকিবের ঘরের কোনো জিনিসে অন্য কাউকে হাত দিতেও দেন না তিনি। ঘর থেকে প্রায়ই শোনা যায় তার ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ।
সম্প্রতি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সোহাগী ইউনিয়নের হাটুলিয়া গ্রামে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের শিকার রাকিব হাসানের (১৮) বাড়িতে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা যায়। কথা হয় নিহতের ছোট ভাই সাকিবুল হাসানের সঙ্গে। পাশে বসে ছিলেন বাবা আব্দুল ছালাম ও মা রুবিনা আক্তার। ছেলের কথা উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রুবিনা।
বিলাপ করে তিনি বলেন, “আমার রাকিব যেদিন মারা গেছে, সেদিনই আমি মরে গেছি। জীবিকার তাগিদে আমরা স্বামী-স্ত্রী ছোট ছেলে সাকিবুলকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকতাম। রাকিব বাড়িতে একাই থাকত। যাদেরকে আমরা ছেলে বন্ধু মনে করে ঘরে আসা-যাওয়া করতে দিয়েছি, তারাই আমার সর্বনাশ করেছে। এখন শুধু ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি, বিচার পাওয়ার আশায়।”
পাশেই ছেলের একটি ছবি হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন বাবা আব্দুল ছালাম। সন্তান হারানোর শোকে মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে স্থানীয় হাটুলিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার পর আর পড়াশোনা করেনি রাকিব।
২০২৫ সালের ৯ জুলাই রাতে হাটুলিয়া গ্রামের নিজ বসতঘরের বিছানায় গলা কেটে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাকিবকে। পরদিন ১০ জুলাই বিকেলে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আব্দুল ছালাম বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলার চার্জশিট জমা দেয়নি পুলিশ। এতে হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা।
এরই মধ্যে নতুন করে বিপাকে পড়েছে পরিবারটি। ছেলের হত্যার বিচার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পার্শ্ববর্তী সৈয়দ ভাকুরী গ্রামের প্রয়াত আব্দুল মান্নানের ছেলে শামছুল হুদা মারুফের বিরুদ্ধে আব্দুল ছালামের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আব্দুল ছালাম অভিযোগ করে বলেন, “আমার ছেলেকে তো হত্যা করেছেই, এখন মামলার ১ নম্বর আসামি জুবায়ের হোসেনের বাবা হানিফ খান পাঠান আমাকে মামলা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করতে হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে মারুফ বিচার পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু বিচার তো দূরের কথা, আসামিরা এখন জামিনে বাইরে ঘুরছে। টাকা ফেরত চাইতে গেলে এখন উল্টো আমাকে মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। ছেলেকে হারিয়ে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আর্থিক সংকটের মধ্যেও প্রতারণা আর হুমকির শিকার হচ্ছি। তবু মৃত্যুর আগে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই।”
জানা গেছে, এ মামলায় রাকিবের মামাতো ভাই জুবায়ের হাসান (১৯), বন্ধু কাউসার আহমেদ (২০) ও জয়নাল (২১) গ্রেপ্তার হলেও বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন। অপর আসামি সাকিব মিয়া (২০) এখনো পলাতক।
টাকা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শামছুল হুদা মারুফ বলেন, আমার উপর আনিত টাকা নেয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমাকে কোন টাকা পয়সা দেয় নাই। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। আমার কাছে এসে একজনকে ফাঁসিয়ে টাকা নেয়ার কথা বললে আমি তাকে মানা করি এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিষেধ করি।
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আজম বলেন, “রাকিব হাসান হত্যা মামলায় তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই চার্জশিট দাখিলের চেষ্টা চলছে। এছাড়া পরিবারকে কেউ হুমকি দিয়ে থাকলে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রকাশকঃ খাইরুল ইসলাম আল আমিন, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৯৫ পাটবাজার (পুকুরপাড়), ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভা, ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ , ওয়েবসাইট-www.durnitibarta.com, মোবাইলঃ 01710-492468, ইমেইল- durnitibartadesk@gmail.com