ময়মনসিংহের গৌরীপুরে গ্রিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক কৃষকের কাছ থেকে জমি ও নগদ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল কাদের নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, সৌদি আরবে নিয়ে ওমরাহ করানোর পর ওই কৃষককে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে আটক হয়ে বিভিন্ন কারাগারে প্রায় দুই মাস নির্যাতন ও দুর্বিষহ জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন মোখলেছুর রহমান (৪৫)।
মোখলেছুর রহমান গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের ধুরুয়া ভাষাবদ্ধ গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে। তিনি এলাকায় কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মোখলেছুর রহমানের অভিযোগ, একই গ্রামের আব্দুল কাদের তাকে গ্রিসে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনে স্ট্রবেরি বাগানে চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। কাদের জানান, তার ছেলে নাঈম গ্রিসে রয়েছে এবং সেখানে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এ আশ্বাসে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন মোখলেছুর রহমান।
চুক্তি অনুযায়ী ২০ লাখ টাকার মধ্যে নগদ পাঁচ লাখ টাকা দেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩৩ শতাংশের বেশি জমি কাদেরের নামে সাফকাওলা দলিল করে দেন। চলতি বছরের ২ এপ্রিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রথমে সৌদি আরবে যান মোখলেছ। সেখানে তাকে দিয়ে ওমরাহ করানোর পর নেওয়া হয় লিবিয়ায়।
মোখলেছুর রহমান জানান, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে আটক করে দেশটির সেনাবাহিনী। প্রথমে ১৪ জনকে একটি ছোট বন্দিশালায় রাখা হয়। সেখানে তিন দিন প্রায় দাঁড়িয়েই থাকতে হয়। কোনো খাবারও দেওয়া হয়নি। পরে তাকে নেওয়া হয় লিবিয়ার বেদা কারাগারে। সেখানে ২৭ দিন বন্দি ছিলেন তিনি।
তার ভাষ্য, কারাগারে সকালে প্রায় ৫০ গ্রাম ওজনের একটি পাউরুটি এবং রাতে অল্প পরিমাণ পাস্তা দেওয়া হতো। পর্যাপ্ত পানিও দেওয়া হতো না। সকাল-বিকেল নিয়মিত নির্যাতন করা হতো বন্দিদের। বেদা কারাগারে দুই শতাধিক বাংলাদেশি বন্দি ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর মোখলেছকে নেওয়া হয় গাম্ভোজা কারাগারে। সেখানেও নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ তার। ওই কারাগারে প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি বন্দি ছিলেন বলেও জানান তিনি।
মোখলেছুর রহমান বলেন, কারাগারে আটকের বিষয়টি তিনি আব্দুল কাদের ও তার ছেলেকে জানালেও তাকে দেশে ফেরানো বা মুক্ত করার বিষয়ে তারা কোনো উদ্যোগ নেননি।
পরে কারাগারে থাকা অন্যদের সহযোগিতায় এক দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মোখলেছ। ওই দালাল দুই লাখ টাকা দিলে বিমানের টিকিট কেটে বৈধভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর কথা জানান। কারাগার থেকে ছেলের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে বিষয়টি জানান তিনি। পরে তার ছেলে উবায়দুর রহমান দালালের দেওয়া হিসাবে দুই লাখ টাকা পাঠান।
মোখলেছুর রহমান জানান, গত ২০ জুন তাকে লিবিয়া থেকে মিসরে পাঠানো হয়। মিসর বিমানবন্দরে প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবস্থানের পর তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন। পরদিন ২১ জুন সন্ধ্যা ৮টা ৩ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
দেশে ফিরে মোখলেছ দেখেন, গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে নেওয়া টাকা ও জমির বিনিময়ে কাদের তার জমিতে ভবন নির্মাণ করছেন—এমন অভিযোগ করেন তিনি। তবে এলাকায় ফেরার পর থেকে কাদেরের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। স্বজন ও এলাকাবাসীও তাকে খুঁজে পাননি বলে জানান মোখলেছ।
এ ঘটনায় মোখলেছুর রহমানের ছেলে মো. উবায়দুর রহমান (২৩) বাদী হয়ে ময়মনসিংহের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি দুটি সাফকাওলা দলিলের মাধ্যমে কাদেরের নামে ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি লিখে দেন মোখলেছ। একই সময় কাদেরের স্ত্রী নাজমা বেগমের উপস্থিতিতে তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে ১১ মে উবায়দুর জানতে পারেন, তার বাবাকে গ্রিসে নেওয়া হয়নি; বরং তিনি লিবিয়ার একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
এদিকে একই গ্রামের মৃত জয়মত আলীর ছেলে মো. ওয়াহেদ আলী অভিযোগ করেন, তার ছেলে আসাদ উল্লাহ উজ্জলকে গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে কাদের ১২ লাখ টাকা নিয়েছেন। পরে অবৈধভাবে বিদেশে নেওয়ার অভিযোগে তার ছেলে প্রায় এক বছর ধরে লিবিয়ার কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাকে মুক্ত করার কথা বলে আরও এক লাখ টাকা নেওয়া হলেও মুক্ত করতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুল লতিফ নামে আরেক গ্রামবাসী জানান, তার ভাতিজা মেহেদী হাসানকে প্রায় নয় মাস আগে গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে কাদের ১২ লাখ টাকা নেন। মেহেদীও বর্তমানে লিবিয়ার কারাগারে আটক রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
একই গ্রামের জামাল মিয়া জানান, তার ভাতিজা উজ্জল আলীকেও কাদের বিদেশে পাঠান। সেখানে তার ১৮ মাসের কারাদণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে নয় মাস সাজা খেটেছেন; আরও নয় মাস কারাগারে থাকতে হবে বলে জানান তিনি।
এলাকাবাসীর দাবি, ধুরুয়া ভাষাবদ্ধ গ্রামের আরও অন্তত ছয়জন ব্যক্তি লিবিয়ার বিভিন্ন বন্দিশালায় আটক রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল কাদেরের বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। তবে কাদেরের মা নুরজাহান বেগম বলেন, মোখলেছকে বিদেশে নেওয়ার জন্য তার ছেলে জমির দলিল করেছেন এবং কিছু টাকা নিয়েছেন—এটি তিনি জানেন। তবে কাউকে জোর করে বিদেশে নেওয়া হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, সবাই অনুরোধ করেই তার ছেলের মাধ্যমে বিদেশে গেছেন। মোখলেছকে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার ছেলের; পরে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। গ্রামটির অনেক মানুষ লিবিয়ার কারাগারে বন্দি থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।

