একের পর এক হাতুড়ির আঘাতে টুংটাং শব্দ আর আগুনের শিখায় লাল হয়ে ওঠা লোহা— সব মিলিয়ে চারদিকে এক ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। এই ছন্দময় শব্দই জানান দিয়ে কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।আগামী ২৮শে মে বৃহস্পতিবার মুসলমানদের পবিত্র কোরবানিকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কামারশালাগুলো এখন কর্মমুখর। বছর ঘুরে বছর আসে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে চারদিকে আনন্দ-উল্লাস, উৎসব ও কোরবানি গরু কেনার ধুম পড়েছে। কোরবানির ঈদের দিন আল্লাহ নৈকট্য লাভের আশায় ত্যাগ করা পশুকে জবাই করতে প্রযোজন যন্ত্রের। তাই মানুষ ছুটছেন কামারশালায়। সারাবছর ব্যস্ততা না থাকলেও কোরবানির ঈদে অপহিার্য ছুরি, দা, দামাসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলা ও পৌরসভার বিভিন্ন হাট বাজারের কামারের দোকান গুলোতে। তাই দিন-রাত তৈরি করছেন নানা যন্ত্রপাতি। ফুলপুরের বিভিন্ন হাট এলাকায় রয়েছে প্রায় ৩৫টির মত দোকান। এখানে গেলেই চোখে পড়ে কামার শিল্পীদের কর্মব্যস্ততা। তারা গরম লোহা পিটিয়ে তৈরি করছেন দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার্য যন্ত্রপাতিসহ পশু কোরবানিতে ব্যবহারের নানা ধরণের ছুরি, চাপাতি, দা, বঁটি, দামা। কামার শিল্পীদের বেশিভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে স্থায়ী কামারদের পাশাপাশি অনেক অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ কামারের দোকানও চোখে পড়ছে।
রূপসী বাজারের কারিগর কার্তিক কর্মকার বলেন, আমাদের অনেকেরই পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এ পেশা। সারা বছর তেমন কাজ না থাকলে অপেক্ষায় থাকি মুসলমানদের এ ধর্মীয় উৎসবের জন্য।বছরের বেশিভাগ সময় কাজ না থাকায় অলস দিন কাটাতে হয়। ফলে ওই সময় কোনো উপার্জন না থাকায় বহু কষ্টে ছেলেমেয়ে নিয়ে দিন যাপন করতে হয়। ঈদুল আজহা এলেই হাতে কাজ বেড়ে যায়। বছরে ছয় মাস কাজ করে যে উপার্জন হয়, ঈদুল আজহার সময় প্রায় দ্বিগুণ উপার্জন হয়। তাই ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারা বছরের ঘটতি পোষাতে নিরলস পরিশ্রম করে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি করেন কামার শিল্পীরা।
কনিক কর্মকার জানান, কোরবানির সরঞ্জাম তৈরির অর্ডার নেওয়া পুরোদমে শুরু হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় লোহা ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার পণ্যের দাম কিছুটা বেশি। এ কারণে অনেক ক্রেতাই ক্ষোভ বা অস্বস্তি প্রকাশ করছেন।
পৌরসভার আরেক কারিগর কামাল বলেন, এখন আমাদের তৈরি সরঞ্জামগুলো বিভিন্ন হার্ডওয়্যারের দোকান ও ভ্যানগাড়িতেও সহজলভ্য। তাই আগের মতো সরাসরি অর্ডার দিয়ে তৈরি করা ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। বছরের ১১ মাস কাজ কম থাকলেও ঈদের এই সময়ে চাপ সামলাতে আমাদের অতিরিক্ত শ্রমিক নিতে হয়, যাদের বেতনও বেশি দিতে হয়। সব মিলিয়ে এ সময় দাম কিছুটা বেশি থাকে।
জামালপুর সদর এলাকা থেকে ছুরি ও চাপাতির অর্ডার দিতে আসা আশরাফ আলী ও ফুলপুরের তপু জানান, গত বছর কেনা সরঞ্জামগুলো অযত্নে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবার নতুন করে অর্ডার দিতে এসেছেন। তবে গতবারের তুলনায় এবার প্রতিটি সরঞ্জামের দাম বেশ চড়া মনে হচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন কর্মকারের সাঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বর্তমান বালু লোহার বাজারদর বড় ছুরি, ১ হাজার ৫শ থেকে ২ হাজার টাকা। চাপাতি ১ জাহার থেকে ২ হাজার টাকা। দা, বঁটি ও ছোট ছুরি, প্রকারভেদে ৫০০ টাকা (কেজি দরে) বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

