সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জের দিকে। আজ রবিবার সেখানে সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচনে ভোট চলছে। এবার প্রথমবারের মতো নাসিকের শতভাগ ভোটকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমে) ভোট নেওয়া হচ্ছে।
সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত চলবে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ভোট গ্রহণ। এটি এই সিটি করপোরেশনের তৃতীয়বারের নির্বাচন। এর আগের দুবার মেয়র পদে জয়ী হন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়া—– আইভী। এবার তিনি একই দলের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী।
মেয়র পদে অন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। হাতি প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের এই সাবেক উপদেষ্টা। বর্তমান সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি- দলের এই সিদ্ধান্তের পরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তৈমূর আলমকে দলীয় সব পদ হারাতে হয়।
গত দুই সিটি নির্বাচনের মতো এবারও নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার নির্বাচনে প্রধান আলোচনায়। সাংসদ শামীম ওসমান ও মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর রেষারেষি নির্বাচনী আলোচনাকে ছাপিয়ে গেছে। নির্বাচনে ওসমান পরিবার না থেকেও আছে জোরালোভাবে। আইভীর পক্ষ বলছে, আওয়ামী লীগের একটি অংশ ও ওসমান পরিবার নির্বাচনে সরাসরি সাবেক মেয়রের বিরোধিতায় নেমেছে। তারা কাজ করছে তৈমূর আলম খন্দকারের হয়ে।
বিএনপির অনুপস্থিতিতে যে নির্বাচনটি আইভীর জন্য হওয়ার কথা ছিল সহজ বিজয়ের, সেটি এখন নানা হিসাব-নিকাশে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছে। আর তাই সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জের দিকে। আইভী ও তৈমূর- দুজনই আশা করছেন, ভোটাররা তাদের বিজয়ী করবে।
এবার মেয়র পদে সাত প্রতিদ্বন্দ্বীর অন্য পাঁচ প্রার্থী হলেন খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন (দেয়াল ঘড়ি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. মাছুম বিল্লাহ (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. জসীম উদ্দিন (বটগাছ), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মো. রাশেদ ফেরদৌস (হাতঘড়ি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল ইসলাম (ঘোড়া)।
এর আগে ২০১১ সালের প্রথম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন শামীম ওসমান, বিএনপির সমর্থিত ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার, স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন সেলিনা হায়া’ আইভী। নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপির নির্দেশে ভোট থেকে সরে দাঁড়ান তৈমূর। নির্বাচনে এক লাখ বেশি ভোটের ব্যবধানে শামীম ওসমানকে হারান আইভী।
২০১৬ সালে এই সিটির দ্বিতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য তৃণমূল থেকে আইভীকে বাদ দিয়ে প্রার্থী তালিকা পাঠানো হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী শামীম ওসমান ও আইভীকে ডেকে নিযে সমঝোতা করে দেন। মনোনয়ন পান আইভী।
এবার মনোনয়নের সময় আইভী তেমন বাধা না পেলেও নির্বাচনী প্রচারণায় শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের দেখা যায়নি। এমনকি শামীম ওসমানের ভাই জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিম ওসমানের অনুসারীরা প্রকাশ্যে আইভীর বিরোধিতায় নামেন। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন সশরীরে।
আওয়ামী লীগের চাপের মুখে শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে আইভীর পক্ষে নিজের অবস্থান জানান দিলেও তা এক ধরনের অস্পষ্টতায় মোড়া বলে খোদ আইভীই সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে এরপর নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় অংশের কাউকে কাউকে প্রচারণায় দেখা গেলেও সেটা তেমন জোরালো ছিল না। আইভী অবশ্য এ নিয়ে তেমন আশা করেননি। তিনি বলেছেন, দল-মতনির্বিশেষে সবার ভোট পেয়ে বিজয়ী হবেন তিনি।
তবে আইভীর হয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ দলের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোর নারায়ণগঞ্জ গিয়ে প্রচারণা চালান নিয়মিত।
এবার জিতলে নারায়ণগঞ্জের মেয়র হিসেবে হ্যাটট্রিক করবেন আইভী। ২০১১ সালে শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটে হারিয়ে দেশের প্রথম নারী মেয়র হয়েছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতকে পরাজিত করেন ৮০ হাজারের বেশি ভোটে। এ ছাড়া ২০০৩ সাল থেকে তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র।
কমিশনের প্রস্তুতি
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে এটাই সর্বশেষ বড় কোনো নির্বাচন। এ জন্য নারায়ণগঞ্জে মডেল নির্বাচন করার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার জানান, নারায়ণগঞ্জে আলাদাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নেই, সবগুলো কেন্দ্রকেই বিশেষ বিবেচনায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নাসিক নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচনে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে ভোটের দিন পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি বিজিবিও মোতায়েন থাকবে নারায়ণগঞ্জের সিটি এলাকায়।
২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর নাসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আজ ভোট হচ্ছে। ২৭ ওয়ার্ডে ১৯২ কেন্দ্রের এক হাজার ৩৩৩ ভোটকক্ষে ভোট নেওয়া হবে। নির্বাচনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৬ জন, মহিলা দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫১১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চার জন।
মোট প্রার্থীর সংখ্যা ১৮৯ জন। এর মধ্যে মেয়র পদে সাতজন, সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৩৪ জন এবং সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মেয়র পদে সাত প্রার্থী হলেন: আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী, স্বতন্ত্র তৈমুর আলম খন্দকার, খেলাফত মজলিসের এ বি এম সিরাজুল মামুন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. মাছুম বিল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. জসীম উদ্দিন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মো. রাশেদ ফেরদৌস, কামরুল ইসলাম স্বতন্ত্র।
প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৫ জন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৬ জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সার্বক্ষণিকভাবে মোতায়েন থাকবে।
মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োগ
এছাড়াও পুরো নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োগ করা হয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ডে একটি মোবাইল ফোর্স, তিনটি সাধারণ ওয়ার্ডে একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স, সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী এলাকার প্রতি থানায় একটি করে রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্স রাখা হয়েছে। এছাড়াও দুটি সাধারণ ওয়ার্ডে একটি করে র্যাবের টিম এবং প্রতি দুইটি সাধারণ ওয়ার্ডে এক প্লাটুন বিজিবিসহ মোট ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
২০১১ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এবার এই সিটিতে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রথমবার নয়টি ওয়ার্ডে ইভিএম বাকিগুলোতে ব্যালট পেপারে ভোট হয়। ২০১৬ সালে সব কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়া হয়।

