বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারগুলো বরাবরই একটি ‘ক্রিটিক্যাল জাংকচার’ বা সন্ধিক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রায় ৫৫০ দিন বা ১৮ মাসের দীর্ঘ পরিক্রমার শেষলগ্নে এসে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল্যায়ন করতে গেলে এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জন- আকাঙ্ক্ষা পূরণের বিষয়টিতে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হলে আমরা চরম একটি দ্বৈততার মুখোমুখি হই। যার একদিকে রয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকরতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা প্রমাণের চেষ্টা, অন্যদিকে ক্ষমতা, সম্পদ ও শ্রমের মৌলিক বিন্যাস পরিবর্তন করে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে অত্যাবশকীয় সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠায় কাঠামোগত অকর্মণ্যতা। কেন বিশাল-বিপুল জনসমর্থন ও অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও অবক্ষয়ক্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় খোলনলচে বদলে ফেলা সম্ভব হলো না? কেন ১৯৭১-পরবর্তী ৫৪ বছরে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সরকারের বাইরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যাপক গণসমর্থন ও জন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও এই সরকারের প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ দেখা যাচ্ছে? কেন অর্থনীতি একটি ‘রিপেয়ার মোড’ থেকে ‘ট্রান্সফরমেটিভ মোড’-এ যেতে পারল না? কিংবা সাফল্য-ব্যর্থতার নিক্তিতে এই সরকার ইতিহাসের পরিক্রমায় কোথায় অবস্থান করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতি শাস্ত্রের ধ্রুপদি তত্ত্বগুলোর সাহায্য নিতে হবে। নির্মোহ ও নিরপেক্ষতার খাতিরে একই সঙ্গে আমাদের বিশ্ব ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হোয়াই মেন রেবেল’-এ রাজনৈতিক সহিংসতার উৎস হিসেবে ‘রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশন’ বা আপেক্ষিক বঞ্চনার তত্ত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জনসমর্থনটি ছিল মূলত বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জনগণ যখন মনে করে পরিবর্তনের একটি সুযোগ এসেছে, তখন তাদের প্রত্যাশা জ্যামিতিক হারে বাড়ে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ এই সময়টিকেই বলেছেন ‘ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর উৎকৃষ্ট সময়’। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন বিপ্লবোত্তর প্রত্যাশার গতি এবং আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের গতি সমান তালে থাকে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রত্যাশার চাপে ছিল, কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা আটকে গিয়েছিল পুরোনো ঘুণে ধরা আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর বৃত্তে। তবে পরিবর্তন কেন হলো না, কিংবা প্রত্যাশা কেন পূরণ হলো না – তার সবচেয়ে জোরালো উত্তর পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতা ও বৈষম্যের কাঠামোকে তীব্র ও নির্ভীকভাবে সমালোচনাকারী কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক সি রাইট মিলস-এর ‘পাওয়ার এলিট’ তত্ত্বে। তার মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের একটি স্থায়ী অংশ, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়, তা অপরিবর্তিত থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ডিপ স্টেট গঠিত হয়েছে স্থায়ী আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনিক ক্যাডার, বৃহৎ ঋণখেলাপি গোষ্ঠী ও ব্যাংক লুটেরা সিন্ডিকেট এবং নিরাপত্তা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সমন্বয়ে। ড্যারেন অ্যাসেম ও জেমস এ রবিনসন তাদের গবেষণায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবস্থাকে ‘এলিট বার্গেইন ট্রাপ’ বা সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর দরকষাকষির ফাঁদে পড়ে যাওয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই এলিটদের ওপর প্রশাসনিকভাবে নির্ভরশীল ও বিশ্বস্ত ছিল বলেই কর অব্যাহতির সংস্কার, ধনীদের ওপর যথোপযুক্ত করারোপ বা ভূমি সংস্কারের মতো মৌলিক কাজে হাত দিতে সাহস করেনি। যখনই নীতিনির্ধারকেরা সংস্কারের কথা বলেছেন, তখনই এই অদৃশ্য শক্তিগুলো ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’-এর মাধ্যমে প্রক্রিয়াটিকে মন্থর করে দিয়েছে। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার অর্থনীতিবিদ রাউল প্রেবিশের ‘ডিপেনডেন্সি থিউরি’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্তর্বর্তীকালীন বা দুর্বল সরকারগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক শক্তির চাপে থাকে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্ত হিসেবে যে ‘কৃচ্ছ্রনীতি’ গ্রহণ করা হয়েছে, তা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আনলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপের সৃষ্টি করেছে। সরকার ভর্তুকি কমিয়েছে এবং সুদের হার বাড়িয়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করলেও উৎপাদনকাঠামো বদলাতে জোরালো বাধা দিয়েছে। ফলে কথা ও কাজে দ্বিচারিতা ফুটে উঠেছে।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তার ‘বুরোক্রেসি অ্যান্ড লেজিটিমেসি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, একটি সরকারের কাজ করার ক্ষমতা তার বৈধতার উৎসের ওপর নির্ভর করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিপুল নৈতিক সমর্থন থাকলেও তারা ‘নির্বাচিত’ছিলনা। এই ‘লিগ্যাল- র্যাশনাল লেজিটিমেসি’র অভাবে সরকার ঘুণে ধরা মৌলিক ক্ষমতাকাঠামো স্পর্শ করতে ভয় পেয়েছে। তারা মনে করেছে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন করার ম্যান্ডেট হয়তো জনগণের দেওয়া এই ক্ষণস্থায়ী সমর্থনের মধ্যে নেই। ফলে তারা নিজেদের এলিট গোষ্ঠীর ভবিষ্যতের ক্রোধানলের আশঙ্কা থেকে রক্ষা করতে কার্যকালের শেষলগ্নে এসে একধরনের ‘ট্রানজিশনাল প্যারালাইসিস’ বা রূপান্তরকালীন পঙ্গুত্বে আটকে যাওয়ার কথা বলছে।
অর্থনীতির মেরামত বনাম রূপান্তর বিষয়টির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথাগত জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যার মোহ থেকে বেরিয়ে এসে সরকার অমর্ত্য সেনের ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ দর্শনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার কিছুটা চেষ্টা করেছে। পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জ্যঁ তিরোল-এর ‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট থিওরি’ অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে তথ্যের ব্যবধান কমানোর এই চেষ্টাটি ছিল ইতিবাচক। আবার ডব্লিউ আর্থার লুইসের ‘ডুয়াল ইকোনমি মডেল’ অনুযায়ী, উন্নয়ন মানে হলো উদ্বৃত্ত শ্রমকে আধুনিক শিল্পে স্থানান্তর। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শ্রমবাজারের বৈষম্য দূর করতে বা এসএমই- কেন্দ্রিক শিল্পনীতিতে কোনো আমূল পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অর্থনীতি সেই নিম্ন- মজুরি ও নিম্ন-দক্ষতার ফাঁদেই আটকে আছে। অথচ হার্নান্দো দে সোতো তার ‘দ্য মিস্ট্রি অব ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, অনানুষ্ঠানিক খাতের সম্পদকে আইনি স্বীকৃতি না দিলে তা ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা মৃত পুঁজি হিসেবে রয়ে যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির সিংহভাগ অনানুষ্ঠানিক হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারাতে এতই ব্যস্ত ছিল যে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আনার জন্য কিছু যে করণীয় আছে, তা আমূল ভুলে গিয়েছে। একইভাবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার-এর ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি’ অনুযায়ী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কেবল সেবা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কিছু বরাদ্দ বাড়ালেও তা মূলত ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ’ সন্তুষ্টিকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, গাছের পাতায় পানি দিয়ে শেকড়কে বাঁচানো যায় না। উচ্চতর দক্ষতা উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য যে পল রোমারের ‘এন্ডোজেনাস গ্রোথ থিওরি’র প্রয়োজন হয়, তার কোনো সুনির্দিষ্ট রোড ম্যাপও এই সরকারের মেয়াদে দৃশ্যমান হয়নি।
সরকার অবারিত সমর্থনকে পুঁজি করে আমূল পরিবর্তনের পথে না হেঁটে একধরনের ‘প্যাসিভ রেভল্যুশন’ বা নিষ্ক্রিয় বিপ্লবের ফাঁদে পা দিয়েছে, যা আন্তোনিও গ্রামসি বর্ণিত শাসকগোষ্ঠীর চিরাচরিত কৌশল হিসেবে পরিচিত। তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ ‘দ্য ইনফরমেশন এজ : ইকোনমি, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ শীর্ষক ট্রিলজির রচয়িতা স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাসেলস অলিভান-এর ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’র শক্তিতে রাজপথ কাঁপিয়ে রাষ্ট্রকে যে পরিবর্তনের জ্বালানি দিয়েছিল, সরকার তার বিপরীতে আমলাতান্ত্রিক ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। জেন-জি যেখানে আনুভূমিক এবং স্বচ্ছ শাসনের দাবি তুলেছিল, নানা মত ও পথের প্রবীণ-অধ্যুষিত সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সেখানে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক খোলসের ভেতর থেকেই সংস্কারের চেষ্টা করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের বাস্তবায়নের এক বিশাল ‘এক্সপেক্টেশন গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে একে ‘এলিট ডিসকানেক্ট’ বলা যায়, যেখানে দেশের অর্থনীতির বাঘা বাঘা পণ্ডিতদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের ভাষা এবং তরুণদের বৈপ্লবিক আবেগকে কেবল টেকনোক্র্যাটিক বা প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার ভুল করেছে। রাজপথের বিপুল জনশক্তিকে অংশীদারত্বমূলক শাসনে অন্তর্ভুক্ত না করে সরকার ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মনে একধরনের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও গণতান্ত্রিক আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই বিপুল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সরকার যে ‘ডিপ স্টেট’ ভাঙতে পারেনি, তা আসলে সাধারণ জনগণের প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ারই নামান্তর।
ইতিহাসের সম্ভাব্য রায় হয়তো খুব সহজ হবে না। ৫৫০ দিনের এই সরকারকে হয়তো স্মরণীয় হতে হবে একটি ‘মিসড স্ট্রাকচারাল মোমেন্ট’-এর প্রতিভূ হিসেবে। তারা হয়তো অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে, রিজার্ভের পতন ঠেকিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মেরামতের চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্ষমতা, সম্পদ ও শোষণের যে চিরস্থায়ী কাঠামো, যে কাঠামো প্রকৃত অর্থে সব সমস্যার মূল উৎস, তা ভাঙার সাহস বা কৌশল তারা দেখাতে পারেনি। এই অধ্যায় আমাদের একটি রূঢ় সত্য মনে করিয়ে দেয় : গণসমর্থন বিপ্লবী চেতনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সমর্থনকে কাঠামোগত রূপান্তরে পরিণত করতে হলে কেবল একদল পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূ পকল্প এবং ডিপ স্টেট ভাঙার মতো সাংগঠনিক শক্তি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়তো একটি ‘অর্ধসুন্দর মুখাবয়ব’ তৈরি করেছে, কিন্তু তার ওপর দাঁড়িয়ে সুন্দর একটি ‘মুখচ্ছবি’ আঁকার দায়িত্বটি শেষ পর্যন্ত পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তির কাঁধেই বর্তাবে।
• লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

